বাংলাদেশ পুরোপুরি সরকারবিহীন ছিল না; বরং ৫–৮ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে একটি সাংবিধানিক/প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। পরে আন্দোলন ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে যান।
এর ফলে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যত পতন ঘটে।
৫ আগস্টের পরপরই:
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও ওই সময়কে “constitutional vacuum” বা সাংবিধানিক শূন্যতার পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রপতি, সামরিক বাহিনী, প্রশাসন, আদালতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর জনগণের মধ্যে ব্যাপক উল্লাস দেখা গেলেও একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায়:
জাতিসংঘের প্রাথমিক বিশ্লেষণে আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে শত শত মানুষের মৃত্যু, হাজারো মানুষের আহত হওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
৬ আগস্ট ২০২৪ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন।
এর ফলে নির্বাচিত সংসদও আর কার্যকর থাকল না এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য পথ তৈরি হলো।
এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর একটি কার্যকর নির্বাচিত সংসদও আর থাকল না।
৫ আগস্টের পর ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, নির্বাচনের আগে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করবে।
৮ আগস্ট ২০২৪ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ Muhammad Yunus প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।
বাংলাদেশ সরকারের গেজেটেও ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ:
৫ আগস্ট → হাসিনা সরকারের পতন
↓
৬ আগস্ট → সংসদ বিলুপ্ত
↓
৭ আগস্ট → অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা
↓
৮ আগস্ট → ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার
এটি বোঝার জন্য চারটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে।
| ক্ষেত্র | ৫ আগস্টের পর অবস্থা |
|---|---|
| প্রধানমন্ত্রী | পদত্যাগ |
| সংসদ | ৬ আগস্ট বিলুপ্ত |
| মন্ত্রিসভা | কার্যত শেষ |
| প্রশাসন | চালু রাখার চেষ্টা |
| পুলিশ | বড় ধরনের সংকটে |
| সেনাবাহিনী | গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতাকারী ভূমিকা |
| আদালত | কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা |
| অর্থনীতি | ব্যাংক, শিল্প ও ব্যবসা চালু রাখার চাপ |
| আইনশৃঙ্খলা | ব্যাপক অনিশ্চয়তা |
| নির্বাচন | নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন তৈরি |
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আইনশৃঙ্খলা।
অনেক পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়। ফলে স্থানীয় জনগণ অনেক জায়গায় নিজেরাই পাহারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
কারখানা, দোকান, পরিবহন ও অফিস অনেক জায়গায় বন্ধ বা সীমিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্পও আন্দোলনের কারণে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরানো ছিল নতুন প্রশাসনের অন্যতম জরুরি কাজ।
দীর্ঘ আন্দোলন ও সংঘর্ষের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ৮ আগস্ট গঠিত সরকারকে সরাসরি সামরিক সরকার বলা ঠিক নয়।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। জাতিসংঘের রিপোর্টেও ৮ আগস্টের পরের ব্যবস্থাকে civilian Interim Government হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ ছিল:
দ্রুত নির্বাচন → পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর
অথবা
আগে সংস্কার → তারপর নির্বাচন
অন্তর্বর্তী সরকার দ্বিতীয় পথের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়—নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা সামনে আসে।
৫ আগস্টের ঘটনা দেখিয়েছে যে একটি দেশের সরকার পরিবর্তন শুধু প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের বিষয় নয়।
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন:
সরকার + সংসদ + প্রশাসন + পুলিশ + বিচারব্যবস্থা + নির্বাচন ব্যবস্থা + অর্থনীতি + রাজনৈতিক ঐকমত্য
এর যেকোনো কয়েকটি একসঙ্গে দুর্বল হয়ে গেলে দেশে দ্রুত ক্ষমতার শূন্যতা, আইনশৃঙ্খলার সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
জুলাই ২০২৪
→ কোটা আন্দোলন
→ ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন
→ সহিংসতা ও প্রাণহানি
→ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তর
৫ আগস্ট
→ শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ
→ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন
→ প্রশাসনিক/সাংবিধানিক শূন্যতা
৬ আগস্ট
→ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত
৫–৭ আগস্ট
→ আইনশৃঙ্খলার বড় সংকট
→ পুলিশ ও প্রশাসনে অস্থিরতা
→ হামলা, লুটপাট ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা
৮ আগস্ট
→ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার
→ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু
এক নজরে কিভাবে কি!
“সরকারবিহীন বাংলাদেশ” বলতে সবচেয়ে সঠিকভাবে বোঝানো যায় ৫ থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যবর্তী কয়েক দিনের ক্ষমতা ও সাংবিধানিক শূন্যতার পরিস্থিতি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে বিলুপ্ত বা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়নি; বরং পুরনো নির্বাহী সরকারের পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় যাওয়ার একটি অত্যন্ত অস্থির পর্যায় তৈরি হয়েছিল।